অন্ধকারে প্রদীপের আলো

[মৃণালিণী]:

ওগো, শুনছো, তোমায় ভীষণ মনে পড়ছে

[রবি]:

কি আশ্চর্য, আমিও তো তোমার  কথাই ভাবছিলাম, এখনো জেগে রয়েছ!

[মৃণালিণী]:

ঘুম আসছে না

[রবি]:

কি হয়েছে মৃণাল, চাঁদ-পানা মুখের উপর কালো মেঘের ছায়া

[মৃণালিণী]:

ওগো, এই বদ্ধ ঘরে  দম বন্ধ হয়ে আসছে, এ একাকিত্ব আর সহ্য হচ্ছে না

[রবি]:

এই তো কিছুদিন আগে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘুরে গেলে, এত ধৈর্য হারা হলে

[মৃণালিণী]:

আজকাল জীবন্টাকে বড়ই ছোট বলে মনে হয়, আমরা বাকি জীবনটা একই সঙ্গে থাকতে পারিনা?                                                                                                             

[রবি]:

জীবন-প্রবাহে আমরা খড়-কুটোর মতন ভেসে চলেছি, কোথায় চলেছি, কোথায় থামছি

অথবা কোথায় ঠেকছি, কেনইবা ঠেকছি, সেকি আমাদের হাথে ছোটু? তাছাড়া ছেলে-

মেয়ে দের মানুষ করে তুলতে গেলে, এইটুকু স্বাথত্যাগ তো করতেই হবে।

[মৃণালিণী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে]

 

[রবি শ্বান্তনা দেয়]

[রবি]:

অমন উষ্ণ ধারায় ঝরনা হোয়ে বইলে, সে ধারায় আমি অবগাহন করতে পারবো না মৃণাল।

আমার চিত্ত-বৈকল্য ঘটছে, আমায় ক্ষমা  কর।

[মৃণালিণী]:

পায়ে পরি, রাগ কোর না; কখনো, কখনো অন্তরের শীতল দিঘি পারিপ্বাশিক তাপ-প্রবাহের জ্বালায় ঊষ্র প্রস্রবনের রুপ নিতে চায়; আমার এই রুপকে শান্তকরো, সঠিক পথের দিশা দেখাও

[রবি]:

দীপ হয়ে জ্বলে থাকো সর্ব্বক্ষণ, অন্ধকারে আমায় আলো দেখাও, যতক্ষণ না আমি সূর্য হয়ে জেগে উঠি

 

সংক্ষিপ্ত এক পর্যালোচনা  

মেঘাচ্ছন্ন আকাশে রবির প্রকাশ স্তিমিত ।  পূর্ণ সূর্যাগ্রহণে পৃথিবী অন্ধকারাবৃত হয়ে যায় ।  তখন প্রদীপের  আলোই ভরোসা ।  রবি ঠাকুরের আর্বিভাবে বিশ্বাকাসে রাঙ্গা প্রভাতের সৃস্টি। যত দিন বড় হয়েছে, বেলা যত

গড়িয়েছে,  রবির কিরণের উচ্ছাসের জোয়ার বিশ্বজগতকে আরো বেশি করে প্লাবিত করেছে ।  তাঁর সৃস্টির  আলোর বণ্যা আজও প্রবাহমান ।  কিন্তু জগত শ্রেষ্ট এই কবির জীবনেও কখনো কখনো অন্ধকার নেমে এসেছে। কখনো প্রিয়জনদের মৃত্যূ মিছিল, কখনো অর্থাভাব, অহেতুক নিন্দা,কটূক্তি এবং সমালোচনার বণ্যা,

আবার একান্ত ভালোবাসার  ফুলের  অপমৃত্যূ ।  বাহিরে খরস্রোতা  নদীর উচ্ছল ধারা, ভিতরে জটিল চোরা স্রোত। সেই নদীতে ঝড় উঠেছে বহু বার, জীবন তরী দোদ্যুল্যমান, পাল ছিড়ে গিয়েছে। কিন্তু কান্ডারী কবি তাঁর  স্থিতপ্রঙ্গার দ্বারা  নৌকা সামলে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন, তাকে জয় করেছেন।  জীবনের  এই যুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে যিনি আমৃত্যূ তাঁর পাশে থেকেছেন, সহধর্মিনীর ধর্ম পালন করেছেন, নিশ্চুপে এবং নিঃস্বার্থভাবে পতির সেবা করেছেন, তুলসীমঞ্চে প্রদীপ  জ্বেলেছেন , তিনি আর কেঊ নন- একমেবম অদ্বিতীয়ম মৃণালিণী। নৌকার অপর প্রান্তে কান্ডারীর হৃদয়েও তাঁর সহধর্মিনীর জন্য ছিল অপার স্নেহ ও ভালোবাসা।  তাইতো মৃণালিণীর অকাল মৃত্যূতে কবি লিখলেন, ‘ আছে দুঃখ, আছে মৃত্যূ, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।। তবু প্রাণ নিত্য ধারা,  হাসে সূর্য  চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকূঞ্জে  আসে বিচিত্র রাগে।।